হিন্দু ধর্ম

পৃথিবীতে টিকে থাকা সবচেয়ে প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসের নাম হিন্দু ধর্ম। এটিকে অনুসারীরা অনেকে বলে থাকেন ‘সনাতন ধর্ম’ যার অর্থ প্রাচীন বা, ধ্রুপদী। সবচেয়ে বেশী হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের বাস ভারতে। এই দেশের প্রায় ৮৪% মানুষ হিন্দু ধর্মের অনুসারী। এটি পুনর্জন্মে বিশ্বাসী একটি ধর্ম। মানুষ এবং প্রাণীকূলের আত্মা আছে। পূর্বজন্মের কর্মফল অনুযায়ী পরের জন্মে ভালো বা, মন্দ হিসেবে জন্ম হয়। এই চক্র থেকে মুক্তি লাভের উপায় হচ্ছে নির্বাণ লাভ।

ধর্মগ্রন্থ কি?

দুটি ভাগে এই ধর্মের ধর্মগ্রন্থগুলোকে ভাগ করা হয়- স্মৃতি(যা মনে রাখা হয়) আর শ্রুতি(যা শোনা হয়)। এই ধর্মের ধর্মগ্রন্থ মোট কতগুলো সেটি সম্পর্কে সঠিক কোন সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না।

শ্রুতিঃ এটি সবচেয়ে পবিত্র। তবে, আধুনিক হিন্দু সমাজে শ্রুতির চেয়ে স্মৃতি বেশী জনপ্রিয় বলে অনেকেই মনে করেন। বেদ(ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, শামবেদ, অথর্ববেদ), ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ এগুলোকেই মূলত শ্রুতির অন্তর্ভূক্ত করা হয়। হিন্দু দর্শনের বড় অংশ এসেছে শ্রুতি থেকে। (তথ্যসূত্র- Britanica)

স্মৃতিঃ বেদের ধ্যান-ধারণা বা, চিন্তা-চেতনাকে  স্মৃতি সম্প্রসারণ বা, ব্যাখ্যা করে। সাধারণ হিন্দুদের মাঝে এই বইগুলোই বেশী জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এগুলোর মাঝে আছে- কল্পসূত্র(কল্পকথা), পুরাণ(বিভিন্ন পুরনো কাহিনী), দুটি মহাকাব্য- রামায়ণ, মহাভারত, ভগবদগীতা(এটিকে মহাভারতের অংশ বলে মনে করা হয়), মনুস্মৃতি(সামাজিক নিয়ম-কানুন, আচার এগুলো বর্ণীত আছে)।(তথ্যসূত্র- Britanica)

ধর্মের মৌলিক কিছু বিশ্বাস

বিশ্বাসীদের অনেকের মতেই এটি কোন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নয়। Dummies.com এ Amrutur V Srinivasan এর লেখা থেকে পাওয়া তথ্যগুলো আপনাদের জন্য নিজের ভাষায় উপস্থাপন করছি-

  1. সত্য শাস্বতঃ সত্য একটাই, জ্ঞানীরা একে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন
  2. ব্রহ্মই সত্য এবং বাস্তবতাঃ হিন্দুরা বিশ্বাস করে ব্রহ্মই একমাত্র সত্য স্রষ্টা যার কোন আকার নেই, সীমা নেই এবং তিনি স্বর্গীয়। দেখা-অদেখা যা কিছু আছে, সবকিছুর মাঝে ব্রহ্ম আছেন।
  3. বেদই চুড়ান্তঃ প্রাচীন মুনী, ঋষিদের পাওয়া গ্রন্থ বেদ যার শুরু, শেষ বা, ধ্বংস নেই। পৃথিবী নশ্বর, বেদ অবিনশ্বর।
  4. ধর্মের পথে থাকার চেষ্টা করা উচিতঃ ইংরেজী ‘Religion’ শব্দটি ধর্মকে ধারণ করে না। ধর্ম বলতে সঠিক কাজ, ন্যায়-নিষ্ঠতা, নৈতিকতা বুঝায়।
  5. প্রতিটি আত্মাই অমরঃ আত্মার কোন শুরু বা, শেষ নেই। এক দেহ থেকে আত্মা অন্য দেহে যায়। দেহান্তরের অর্থ আত্মার মৃত্যু নয়। কর্মের ভিত্তিতে আত্মার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়।
  6. সব আত্মার লক্ষ্য মোক্ষ লাভঃ আত্মার মুক্তিলাভ হয় মোক্ষে। বারবার জন্মগ্রহণ করার যে চক্র, এই চক্র থেকে মোক্ষলাভের মাধ্যমে মুক্তি মিলতে পারে।

ইহুদী বিশ্বাসের মত টেন কমান্ডমেন্ট, খ্রিস্টানদের নিউ টেস্টামেন্ট বা, মুসলিমদের মত কুরআন নির্ভর নিয়ম-কানুন হিন্দু ধর্মে নেই। বিভিন্ন অঞ্চলের প্রচলিত কৃষ্টি, সংস্কৃতি অনুযায়ী আচার আচরণ পরিবর্তিত হয়।

900 মিলিয়ন অনুসারী নিয়ে এই ধর্ম বিশ্বাসী জনসংখ্যার ভিত্তিতে খ্রিস্ট ধর্ম এবং ইসলাম ধর্মের পর তৃতীয় অবস্থানে আছে। ইতিহাসবিদদের মতে এটি ৪০০০ বছরের পুরনো, বিশ্বাসীদের মতে এটি আরো প্রাচীন। history.com এর দেয়া তথ্য অনুযায়ী এটি কোন নির্দিষ্ট ‘Religion’ নয়, এটি অনেকগুলো ‘Religion’ এর একটি সমন্বয়। এটি অনেক সময় তাই বলা হয় জীবনের পথ। সংসার এবং কর্ম এই ধর্মের দুটি বিশ্বাস। পুনর্জন্মের চক্রকে বলা হয় সংসার এবং সংসারে মানুষের অবস্থান নির্ধারিত হয় কর্মের মাধ্যমে।

বাংলায় একটি কথা আছে, “জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো”। কর্মের মাধ্যমে মানুষ ধর্মের পথে থাকার চেষ্টা করে। ওম এবং স্বস্তিকা হিন্দু ধর্মের দুটি প্রতীক। অনেকে এটি মনে করে বিভ্রান্ত হন যে, হিটলারের নাৎসি বাহিনীর প্রতিক স্বস্তিকা। আসলে স্বস্তিকা সোজা এবং নাৎসি বাহিনীর চিহ্ন কিছুটা বাঁকা। এটিকে বলতে পারেন- হিটলার স্বস্তিকা বাঁকিয়ে ঘৃণার চিহ্নে পরিণত করেছে। স্বস্তিকা চিহ্ন ভাল কাজের নিয়ামক হিসেবে পরিচিত।

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে স্বস্তিকা চিহ্নের মত চিহ্ন প্রচলিত ছিল। এবং এটি হিন্দু ধর্ম ছাড়াও বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের অনুসারীদের কাছে পবিত্র। কানাডা, মেসোপটেমিয়াসহ আরো অনেক জায়গায় এর প্রচলন ছিল

এই ধর্মের বিশ্বাস ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম। হয়ত অনেক কিছুই বাদ পড়ে গেছে, হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে যারা ধারণা পেতে আগ্রহী এই লেখাটি আশা করি তাদের সঠিক ধারণা পেতে সাহায্য করবে।

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://www.culturalindia.net/indian-religions/hinduism.html
  2. https://www.history.com/topics/religion/hinduism
  3. https://www.dummies.com/religion/hinduism/core-beliefs-of-hindus/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *